সবুজে ঘেরা দিঘী নীলসাগর

এখনই ডেস্ক নিউজঃ
  • প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল ২০২১, ৬:০১ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩ মাস আগে

নীলসাগর! পানি সমুদ্রের মতো নীল নয়, সেই সাগরের নেই উত্তাল ঢেউ। নিম্নচাপের প্রভাবে গর্জে ওঠে না এটি, ভয় নেই জলোচ্ছ্বাসেরও। এরপরও এর নাম সাগর, নীলসাগর। বলছি, উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ জেলা নীলফামারীর বেশ পরিচিত পর্যটন স্পট নীলসাগর দিঘীর কথা।  নীলফামারী-দেবীগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত বিশাল দিঘীটির কোমল বাতাস আর শান্ত জল যেনো নিমিষেই ক্লান্তি দূর করে দেয় কোনো পথিকের।

নীলফামারী  জেলা  শহর থেকে উত্তর-পশ্চিমে ১৪.৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা মৌজায় নীলসাগর দীঘি  অবস্থিত। মোট আয়তন ৫৩.৯০ একর, মূল দীঘি ৩২.৭০ একর। আনুমানিক খননকাল অষ্টম শতাব্দীর কোন এক সময়ে। হিন্দুশাস্ত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম হতে নবম শতাব্দীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিরাট রাজা পান্ডবদের এবং রাজা ভগদত্তকৌরবের পক্ষ অবলম্বন করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কৌরব  এবং  পান্ডবদের পাশা  খেলা হয়। খেলার শর্ত অনুযায়ী পরাজিত হয়ে পান্ডবরা বারো বছরের জন্য বনবাসে যেতে বাধ্য  হয়।

পরাজিত পান্ডবরা  বিরাট রাজার রাজ্যভূক্ত গোগৃহে (কথিত আজকের গোড়গ্রাম) স্বেচ্ছা নির্বাসনের স্থান মনোনীত করেন। পান্ডবদের তৃষ্ণা  মেটাবার জন্য বিরাট রাজা তখন এই বিশাল দীঘিটি খনন করেন। বিরাট দীঘি অপভ্রংশের  মাধ্যমে কালক্রমে “বিরাটদীঘি”, “বিল্টাদীঘি” এবং অবশেষে “বিন্নাদীঘি” হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব আঃ জব্বার এ দীঘিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংস্কারের পাশাপাশি এর নামকরণ করেন “নীলসাগর”। পানির গভীরতা মাঝে ২৩ ফুট (জুন-অক্টোবর),পাড় ঘেষে ০৪ ফুট।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই মূলত নীলসাগর বিখ্যাত। এর পাড়ে রয়েছে নারকেল, বনবাবুল, আকাশমণি, মেহগনি, শিশুসহ অজানা-অচেনা হরেক রকম ফুল ও ফলের সারি সারি বৃক্ষরাজি। শীতকালে বিভিন্ন দেশের রাজহাঁস, মার্গেঞ্জার, মাছরাঙা, ভুবনচিল, সবুজ চান্দি ফুটকি, বাচাল নীল ফুটকি ইত্যাদি অতিথি পাখিদের সমাগমও বৃদ্ধি পায়, এছাড়াও পাশেই রয়েছে একটি ছোট পার্ক। ১৯৯৮ সালে এ এলাকাকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। দিঘীটির পূর্ব পাড়ে একটি মন্দির রয়েছে। যেখানে প্রতি প্রহরেই পূজা-অর্চনা হয়। এছাড়া অমাবস্যা পূর্ণিমার সময় কীর্তন গান স্থানীয় কীর্তনিয়া পাড়ার শিল্পীরা। এখানে প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে সনাতন (হিন্দু) সম্প্রদায় বারুণী স্নান উৎসবের আয়োজন করে থাকে।

দিঘির পাশেই সরকারের অনুদানে একটি রেস্টহাউজ স্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারেন। চব্বিশ ঘণ্টার জন্য সিঙ্গেল বেডরুম ২০০ টাকা, ডাবল বেডরুমের ভাড়া ৪০০ টাকা।

আর খাওয়া নিয়েও চিন্তার কোনো কারণ নেই। নীল সাগরে ঢোকার মুখেই পাবেন আলমগীর ভাইয়ের খাবারের দোকান। ঘরের মাছ-মুরগি-সবজি-ডিম-আলু ভর্তা দিয়ে পেট পুরে খেতে পারবেন অল্প টাকায়। যেকোনো তিনটি আইটেম খেলে ৩০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যেই হয়ে যাবে।

নীলসাগরে ঢুকতে জনপ্রতি গুণতে হবে ১০ টাকা। বাইসাইকেল পার্কিংয়ে দিতে হবে ১০ টাকা, মোটরসাইকেলের জন্য ৫০ টাকা, মাইক্রোবাস ১০০ টাকা আর বড় বাসের জন্য পার্কিং ফি ২০০ টাকা। এই দুর্মূল্যের বাজারে উল্লেখিত টাকার অংক বেশি কিছু না।

নীল সাগর দেখতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে উঠে পড়ুন ‘নীল সাগরে’। আন্ত:নগর এই ট্রেন আপনাকে সোজা নিয়ে যাবে নীলফামারী জেলা শহরে। ভাড়া পড়বে এসি সাড়ে ৫০০ টাকা, নন এসি সাড়ে ৩০০ টাকা।

আর যদি সড়ক পথে যেতে চান তাহলে কল্যাণপুর থেকে উঠে পড়ুন এসআর ট্রাভেলস অথবা এসআর প্লাসে। এ কোম্পানির এসি/ননএসি দুই ধরনের বাসই আছে। এসিতে গেলে ভাড়া পড়বে ৮০০ টাকা, নন এসিতে সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এ ছাড়া হানিফ, শ্যামলী, নাবিল অথবা আগমনী পরিবহনে রংপুর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে নীলফামারী যেতে পারবেন।

আর নীলফামারী শহর থেকে পঞ্চগড়ের দেবিগঞ্জগামী বাস ছাড়াও অটোবাইক, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেলে করে ৩০ মিনিট ভ্রমণেই অনায়াসে পৌঁছে যাবেন নীল সাগর।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

কারিগরী সহায়তায়: নি-টেক