সেতু নির্মাণ ব্যয় নিয়ে জ্ঞান পাপীদের মিথ্যাচার

এখনই ডেস্ক নিউজঃ
  • প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল ২০২১, ৭:৪০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩ মাস আগে

সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এর আর্থিক সহায়তায় শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর দৈর্ঘ্য সোয়া কিলোমিটারের মতো। প্রকল্প অনুমোদনের ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১০ সালে পদ্মা সেতু ও তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্প অনুমোদন দেয়। খরস্রোতা পদ্মার ওপর সোয়া ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পথে। অথচ নদীর পরিস্থিতি অনুকূল থাকার পরও মাত্র ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাজ এখনো শেষ হয়নি।

গত ২৯ এপ্রিল একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের “সেতু ছোট, নির্মাণে দশক পার, ব্যয় বেড়েছে ৬২%” শিরোনামের খবরে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ে সেতুর কাজ শেষ করতে না পারায় ৩৭৭ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ৬১০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। খরচ বেড়েছে ২৩৩ কোটি টাকা, যা শুরুর ব্যয়ের চেয়ে ৬২ শতাংশ বেশি। বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ জোগান দিতে হবে সরকারের তহবিল থেকে। নতুন ব্যয় কাঠামো অনুযায়ী, সরকার দেবে ২৬৫ কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৬৫ কোটি টাকা। আর এসএফডি দেবে ৩৪৫ কোটি টাকা।

গুরুত্ব-প্রয়োজনীয়তা, নকশা ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে পদ্মা সেতুর সঙ্গে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর তুলনা হয় না। তবে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় নির্মাণাধীন শীতলক্ষ্যা সেতুটির গুরুত্বও নেহাত কম নয়। কারণ, সেতুটি হলে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদরের সঙ্গে বন্দর উপজেলারও সংযোগ ঘটবে।

নানা যৌক্তিক কারণের সাথে আমলা ও ঠিকাদারদের অযৌক্তিক কিছু লালসা পূরণে যে সেতুর নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে তা প্রতিবেদনে বেমালুম চেপে, ইচ্ছাকৃত ভাবে টুইস্টিং শিরোনাম করা হয়েছে যাতে দেশের মানুষ ভুল বোঝে। যদিও প্রতিবেদনের শেষ দিকে বলা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রকল্পের নথিপত্র সূত্র জানাচ্ছে, এই প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগ দিতেই লেগে যায় সাত বছর। কারণ, সেতুর নির্মাণ ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ নিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে অর্থায়নকারী সংস্থা এসএফডির টানাপড়েন চলে।

কোন কোন ঋণ চুক্তিতে কনসাল্টেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত থাকে, এসএফডির ক্ষেত্রে তা ছিল; খবরটা পড়লে তা বোঝা যায়। নিয়োগপ্রাপ্ত  কনসালটেন্টের কাজ হচ্ছে প্রকল্পের ডিজাইন করা, টেন্ডার করা আর ডিজাইন অনুসারে ঠিকাদার কাজ করছে কি না তা তদারক করা। ডিজাইন অনুসারে কাজ হলে কনসালটেন্টের মেজারমেন্ট বইতে ও বিলে সই দেওয়ার পরেই ঠিকাদার বিল পায়, তার আগে কাজের বিল পায় না। কনসাল্টেন্ট নিয়োগের চুক্তি হলে সব চুক্তিতেও দেশের দ্রব্য মূল্যের বৃদ্ধির গড় হিসাব করে বছরে গড়ে ৫.৫ ভাগ করে ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া থাকে ঐ চুক্তিতে। এটা একটা ষ্ট্যাণ্ডার্ড বিষয়, সেটা জাইকা, বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, বা সৌদি ফাণ্ড যার তহবিলই নেওয়া হউ না কেন।

এছাড়া কনসাল্টেন্ট যখন প্রকল্পের ডিজাইন করতে প্রকল্পের আকার ভেদে ২/৩ বছর লেগে যায়, বাকী প্রকল্প মেয়াদে তারা টেন্ডারিং ও কাজের তদারকি করে। কনসাল্টেন্ট একনেক অনুমোদিত প্রাক্কলিত মূল্যের (এস্টিমেটেড ভ্যালু) সাথে বর্তমান বাজার দর ও তার মূল্য বৃদ্ধির ডাটা এনালাইসিস করেও প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় হিসাব করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ সামগ্রীর ব্যয় চাঁদে চাঁদে বাড়ে, বেড়ে যায়, বাড়লে কমে এমন উদাহরণ খুব কম। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার জন্য প্রকল্পে নিযুক্ত জনশক্তির ব্যয় ও বেড়ে যায়।

প্রকল্প ২০১০ সালে যখন একনেকে অনুমোদিত হয় তখন তার প্রাক্কলিত ব্যয় বা এস্টিমেটেড ভ্যালু ধরা হয় ৩৭৭ কোটি টাকা। প্রকল্প অনুমোদনের পরে কনসাল্টেন্ট নিয়োগে সময় লেগেছে ৭ বছর। দেশের দ্রব্য মূল্যের বৃদ্ধির গড় হিসাব করে বছরে গড়ে ৫.৫ ভাগ করে ব্যয় বৃদ্ধির মানে এস্টিমেটেড ভ্যালু তখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটির কাছাকাছি। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির অন্য কারণ একটু পরে হিসাব করে দেখা যাক।

এ ধরণের প্রকল্পের ডিজাইনের আগে সয়েল টেস্ট করা হয়, যেখানে কনসাল্টেন্টদের ফাঁকি দিয়ে বেশী কমিশনের আশায় প্রায় ক্ষেত্রেই প্রকল্প পরিচালকের অফিসের সাথে সয়েল টেস্টের বাংলাদেশি ঠিকাদার মিলে এমন রিপোর্ট দেয় যার উপর ভিত্তি করে ডিজাইন করলে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে বাধ্য। কারণ প্রকল্পে সব ধরণের নিয়োগ দেয় প্রকল্প পরিচালক অফিস, কনসাল্টেন্ট সুপারিশ করেন মাত্র। বা কনসাল্টেন্ট নিয়োগ দিলেও তার অনুমোদন লাগে প্রকল্প পরিচালকের অফিস থেকে। টেস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী মনে করুন পাইল লাগবে ১০০ ফুট সেখানে রিপোর্ট দেওয়া হয় ১৫০ ফুট।  ৫০ফুট পাইলিং এর টাকা ভাগাভাগি হয় সরকারি দপ্তরের অফিসের মানুষের সাথে। সাধারণত ১০০ বা ৫০ মিটার দূরে দূরে সয়েল টেস্টের বোরিং করা হয়। ডিজাইনের সময় যদি কোন পিলারের অবস্থান দুই সয়েল টেস্টের পয়েন্টের মাঝে পড়ে আর সেখানকার সয়েল কন্ডিশন খারাপ হয় তাহলেও ডিজাইন এমন করতে হয় যে, তাতে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে পারে, যেমনটি হয়েছিল পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে। যেভাবেই হউক প্রকল্প ব্যয় বাড়লে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রকল্প অফিসের  লোকেদের কমিশনের অংক বেড়ে যায়। এখানে কনসালটেন্ট অফিসিয়ালি কিছুই করার থাকে না, আবার সরকার থাকে অসহায়।

প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে প্রাক্কলিত সময়র চেয়ে বেশী সময় লাগলে কিংবা সরকারের একনেকে আগে পাস হওয়া অন্য প্রকল্পের সাথে নতুন প্রকল্পের কোন অংশ নিয়ে জটিলতা দেখা দিলেও ডিজাইন চেঞ্জ করতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়।

এবার আসি কষ্ট এস্টিমেটরের কারসাজি নিয়ে। প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রে যেমন কনসালটেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকেও অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়। তারা ইচ্ছা করলে যে কোন কনসালটেন্টকে মানে এক্সপার্টকে পরিবর্তন করতে পারেন, তার ক্ষমতা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে চুক্তিতে দেওয়া থাকে। কনসালটেন্টের খরচ কমাতে সাধারণত Key Expert থাকে বিদেশী আর থাকে কিছু Non Key Expert যারা অধিকাংশই থাকেন লোকাল এক্সপার্ট, প্রকল্পের কনসালটেন্সি খরচ কমাতে। এই ধরণের অধিকাংশ প্রকল্পে লোকাল এক্সপার্ট থাকেন প্রকল্পের কষ্ট এস্টিমেটর। এই কষ্ট এস্টিমেটরগন চাকরির ভয়ে প্রকল্প পরিচালকের অফিসের চাপে প্রকল্পের জন্য মালামালের বাজার মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে থাকেন, এতেও প্রকল্পর খরচ বেড়ে যায়, যেখানে সরকারের কিছু করার থাকে না। কারণ এসব হাইলি টেকনিক্যাল ইস্যু।

বাংলাদেশের বড় বড় মিডিয়া হাউজের মালিকদের অনেকের আছে লোকাল কনসাল্টিং ফার্ম। বিদেশী বড় বড় কনসালটিং ফার্মের লোকাল এজেন্ট। তাদের অনুমোদিত বিদেশী ঠিকাদার বা কনসালটেন্ট কাজ না পেলেই বড় বড় মিডিয়া হাউজ এমন মোটিভেটেড নিউজ করে থাকে। এর আগেও এমন এই হাউজের মিডিয়ায় নিউজ করেছে, মামলা করায় প্রকল্পের টাকা ফেরত যাওয়ার প্রমাণ আছে।

সব জেনেই এরা সরকার বিরোধিতার নামে করে দেশের বিরোধিতা, এরা জ্ঞান পাপী।

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

কারিগরী সহায়তায়: নি-টেক