হাত বাড়ালেই হেলিকপ্টার

এখনই ডেস্ক নিউজঃ
  • প্রকাশিত: ৭ মে ২০২১, ৬:০২ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩ মাস আগে

দেশে হুহু করে বাড়ছে হেলিকপ্টারের চল৷ ২৪ ঘণ্টা আগে বুকিং দিয়ে এখন যে কেউ দেশের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে চাইলেই উড়ে যেতে পারেন এই বাহনে৷

বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েক বছর আগেও দেশে হেলিকপ্টার চলাচল ছিল খুবই কম৷ সেটা এখন বহুগুণে বেড়েছে৷ করোনাভাইরাস মহামারিতে কিছুটা কমলেও এখনো বেশ ব্যস্ততা রয়েছে হেলিকপ্টার অপারেটরদের৷
এতদিন এই হেলিকপ্টার যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর৷ তবে পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়েছে যে, এখন আর সেখানে এত এত ফ্লাইট সামাল দেয়া যাচ্ছে না৷ তাই হেলিকপ্টারের জন্য আলাদা একটি হেলিপোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ৷ অবশ্য এই খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটা আরো আগেই হওয়া উচিত ছিল৷ বাংলাদেশে এয়ারলাইন্স, হেলিকপ্টার অপারেটর, জেনারেল এভিয়েশন আউটফিট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন হচ্ছে, এভিয়েশন অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ৷ এক সময় এটাকে সাধারণ যাত্রী পরিবহনকারী এয়ারলাইন্সগুলোর সংগঠন বলে মনে করা হতো৷
তবে এভিয়েশন অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, এখন তাদের সংগঠনের বেশিরভাগ সদস্য হেলিকপ্টার অপারেটররাই৷

বাংলাদেশের যোগাযোগ সংস্কৃতিতে হেলিকপ্টার 

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার নাসিরউদ্দিন মির্জা বিয়ে করেন হেলিকপ্টারে উড়ে গিয়ে৷ সেই সময় তিনি ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি৷ বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ঘণ্টার যাত্রায় পাশের গ্রামে বিয়ে করে তিনি বউ নিয়ে ফিরেছিলেন বাড়িতে৷ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতির হেলিকপ্টারে বিয়ের এই ঘটনায় অনেকেই সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন সামাজিক মাধ্যমে৷ এখন গ্রামে-গঞ্জে এভাবে হেলিকপ্টারে বিয়ের খবর প্রায়ই সংবাদে শিরোনাম হয়৷ মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুরেও প্রত্যন্ত গ্রাম, এমনকি চরেও হেলিকপ্টারে বিয়ের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে৷

বিয়ের মতো উপলক্ষ্যে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা ব্যক্তিরা সমালোচনায় মুখে পড়ার পর তাদের পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের একজন সোস্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সোলায়মান সুখন৷
তিনি সেই সময় একটি ভিডিও’তে বলেছিলেন, ‘‘কেউ যদি বিয়ের জন্য হেলিকপ্টার নিয়ে যেতে চায়, যাবে৷ ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ৷ আমরা যাতে নেগেটিভলি ফেইসবুক ভরিয়ে না ফেলি৷ এ রকম তো হয়, একটা-দুইটা গরু না কেটে সে তো করতেই পারে৷’’

দেশের প্রথম বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার অপারেটর কোম্পানি সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্সের অপারেশন ডিরেক্টর স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) গুলজার হোসেন বলেন, ‘‘এটা এখন আর বিলাসবহুল বিষয় না৷ এটা এখন একটা সাধারণ যাত্রী পরিবহন সেবা৷ এভাবেই এটাকে দেখতে হবে৷’’ বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের কাছে হেলিকপ্টার বা বিমান এখনো ‘আকাশে উড়া রহস্যের বাহন’৷ আকাশ দিয়ে বিমান চললে অনেকেই ছুটে আসেন উঠোনে৷ আর এ রকম বিয়ে, ওয়াজের মতো উপলক্ষ্যে কোথাও হেলিকপ্টার নামলে সেখানে কেবল শিশুরাই নয়, বরং নানা বয়সের নারী-পুরুষরা ভিড় করেন৷ তবে এখন হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে নানা জরুরি প্রয়োজনে৷ জরুরি কর্পোরেট যাতায়াত, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বায়ারদের কারখানায় নেয়া, মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন, শুটিং-ফিল্মিং, বার্ড আই ভিউ টুরিজমের মতো নানা কারণে মানুষ এখন হেলিকপ্টার ব্যবহার করে৷

যাদের হাত ধরে বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক হেলিকপ্টারের যাত্রা শুরু হয় সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্সের হাত ধরে৷ কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে৷ এই কোম্পানির অপারেশন ডিরেক্টর স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) গুলজার হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘২০০০ সালের দিক থেকে আমরা হেলিকপ্টার ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকি৷ বাংলাদেশে এখন যেসব কোম্পানির হেলিকপ্টার রয়েছে, তারা সবাই মূলত এক সময় আমাদের ক্লায়েন্ট ছিল৷ চাহিদা বাড়ার পর এখন তারা নিজেরাই প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে৷’’
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সেই সময় দুইটা হেলিকপ্টার ছিল৷ এই দুইটা হেলিকপ্টার দিয়ে পুরো বাংলাদেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়নি. তাই অনেকে চাইলেও আমরা ফ্লাইট দিতে পারিনি৷ তখন আরো কোম্পানির জন্ম হয়৷

কারা দেয়, কাদের দেয়?

বর্তমানে স্কয়ার এয়ার লিমিটেড, মেঘনা এভিয়েশন, আর অ্যান্ড আর এভিয়েশন কোম্পানি লিমিডেট, বসুন্ধরা এয়ারওয়েজ, ইমপ্রেস এভিয়েশন, বিআরবি এয়ার লিমিটেড, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স, পারটেক্স এভিয়েশন, বিসিএল প্রভৃতি কোম্পানি এই সার্ভিস দেয়৷
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে হেলিকপ্টার সেক্টরের যাত্রা বেশিদিনের না৷ ১১টা অপারেটর আছে৷ তাদের আন্ডারে ৩১ হেলিকপ্টার আছে৷ ’’
“অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান আছে, যারা নিজেদের চাহিদা পূরণ করতে হেলিকপ্টার কিনেছে৷ সেখানে যখন তাদের প্রয়োজন হয় না, সেটা বাণিজ্যিকভাবে দিয়ে দেয়৷” ঘণ্টায় ৬০ হাজার টাকা দিলেই এখন হেলিকপ্টার ভাড়া নেয়া যায়৷ তবে হেলিকপ্টারের আসন, ধরন ইত্যাদি ভেদে ভাড়া হেরফের হয়৷ অনগ্রাউন্ড অপেক্ষায় থাকার সময় আলাদা আলাদা চার্জ নেয় কোম্পানিগুলো৷ তবে কোনো কোনো হেলিকপ্টারে প্রথম এক-দুই ঘণ্টায় এই চার্জ দরকার হয়৷ হেলিকপ্টার ভাড়া নিতে হলে যাত্রা এবং গন্তব্যের স্থান, যাত্রীদের পরিচয় ইত্যাদি উল্লেখ করে ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করে বুকিং দিতে হয়৷ কোনো বিদেশি যাত্রী থাকলে তাদের পাসপোর্টের অনুলিপিসহ আরো নানা তথ্য জমা দিতে হয়৷ হেলিকপ্টার কোথায় নামবে, তার ব্যবস্থা করতে হয় যাত্রীকেই৷ একইসঙ্গে স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করে প্রয়োজনে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তাদেরকেই করতে হয়৷ বুকিং পাওয়ার পর যাত্রীর তথ্য নিয়ে হেলিকপ্টার কোম্পানিগুলো সিভিল এভিয়েশনের কাছে উড্ডয়নের আবেদন করে৷ বর্তমানে সাধারণ যাত্রায় উড্ডয়নের অন্তত ২৪ ঘণ্টা পূর্বে এই আবেদন করতে হয়৷ বেবিচক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘নিরাপদ গমনাগমন নিশ্চিতে আমাদেরকে এসব নিয়ম করতে হয়েছে৷ তবে জরুরি মেডিকেল ইভাকুয়েশনে আমরা তাৎক্ষণিক অনুমতি প্রদান করি৷’’ সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্সের অপারেশন ডিরেক্টর স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) গুলজার হোসেন বলেন, ‘‘শিল্পপতিরা এখানকার সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী৷ হয়ত বিমানবন্দরে বায়ার এসে নেমেছে৷ সেখান থেকেই তাদেরকে স্পটে নিয়ে গিয়েছি৷’’

“বাংলাদেশে বাইরোডে যাওয়া কতটা কষ্টসাধ্য-সেটা বলার মতো না৷ একবার কেউ গেলে আর যেতে চাইবে না৷ এখানে ইনটানজিবল ভ্যালু হিসাব করতে হবে৷ যাওয়ার সমস্যা হলে হয়ত আরেকবার আসতোই না৷ এখন তাদের জন্য এই সার্ভিসটা দেয় হেলিকপ্টার৷”
তিনি বলেন, ইমপ্রেসের একটা হেলিকপ্টার আছে৷ সেটা মেডিক্যালি ক্যাপাবল৷ গত কয়েক মাসে তারা ওই একটা হেলিকপ্টার দিয়ে এই করোনার সময় ১৬৫টি মিশন করেছে৷  “বেশ কিছু কোম্পানির হেলিকপ্টার এখন মেডিক্যাল ইকুইপড৷ তারা দ্রুত রোল চেইঞ্জ করতে পারে৷ বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো ক্রিটিক্যাল রোগীকে যে কোনো সময় তারা ট্রান্সফার করতে পারে৷” “খুব দ্রুতই ডেডিকেটেড হেলিকপ্টার ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল সার্ভিস বাংলাদেশে চলে  আসবে৷ কারণ, এটার চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে৷”
এছাড়াও শুটিং, ফিল্মিংয়েও অনেকে এই সার্ভিস দেয়৷
এক প্রশ্নের জবাবে গুলজার বলেন, ‘‘ওয়াজ করতে যাওয়া হুজুরদের হেলিকপ্টার ভাড়ার বিষয় মৌসুমী৷ এটা শীতকালে হয়৷ কারণ আমাদের দেশে বর্ষাকালে কোনো ওয়াজ হয় না৷ ’’
“তবে হুজুররা কোথাও গেলে সেখানে অনেক মানুষ থাকে, তারা ভিডিও করে৷ সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে চলে এসে আলোচনার জন্ম দেয়৷ কিন্তু কর্পোরেট প্রয়োজনে যিনি নিচ্ছেন, তারটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না৷ কারণ, তিনি যেখানে নামেন, সেখানে কেউ সেটা ভিডিও করে না৷”

আসছে হেলিপোর্ট

সাধারণ যাত্রী পরিবহনকারী বিমানগুলো যেখানে ওঠানামা করে, সেটাকে এয়ারপোর্ট বলে৷ আর হেলিকপ্টারের জন্য নির্ধারিত জায়গাকে বলে হেলিপোর্ট৷ বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো হেলিপোর্ট নেই৷ বরং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই কাজ চালানো হয়৷
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, প্রত্যেক বড় সিটিতে এক বা একাধিক হেলিপোর্ট থাকে৷ দিল্লি, লন্ডন, প্যারিসে হেলিপোর্ট আছে৷ আমাদের সাইজের চেয়ে ছোট হেলিকপ্টার ইন্ডাস্ট্রির দেশেও হেলিপোর্ট আছে৷ আমাদের ঘনবসতির কারণে এখানে হেলিকপ্টার নামা কঠিন৷ তাই এখানে হেলিপোর্ট দরকার৷
“আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দিক থেকেও হেলিকপ্টারকে আলাদা করে দিতে হয়৷”
হেলিকপ্টারের চাহিদা ক্রমেই বাড়তে থাকায় হেলিপোর্ট নির্মাণের দিকে যাচ্ছে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ৷
বেবিচকের চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান বলেন, ‘‘শাহজালাল বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনালের কাজ চলছে৷ তাই সেখানে হেলিকপ্টার রাখা যাচ্ছে না৷ আপাতত তাই উত্তর দিকে জেনারেল এভিয়েশনের সাইটে সরিয়ে নেবো৷ পরে হেলিপোর্ট হয়ে গেলে সেখানে নিয়ে যাবো৷’’
তিনি বলেন, ‘‘রাজধানীর খিলক্ষেতের কাওলায় হবে এই হেলিপোর্ট৷ এর কাজ এখন ডিজাইন পর্যায়ে আছে৷ আমরা জায়গা নির্ধারণ করে ফেলেছি৷ এটা ভরাট করতে হবে৷ সিভিল এভিয়েশনের একটা জায়গাতেই করবো৷’’

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ২৮-২৯টা হেলিকপ্টার আছে৷ এখন যে হেলিপোর্ট করছি, সেখানে ন্যূনতম ৫০টি হেলিকপ্টার থাকতে পারবে৷ এটাকে আরো এক্সপানশন করা যাবে৷ আপাতত জায়গা ভরাট এবং নকশার কাজ করছি৷ আগামী দুই বছরের মধ্যে এই কাজ শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি৷’’

আগামীর চ্যালেঞ্জ

দেশের প্রথম বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার অপারেটর কোম্পানি সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্সের অপারেশন ডিরেক্টর স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) গুলজার হোসেন বলেন, আমাদের এখানে দক্ষ জনবলের সংকট সবচেয়ে বড় সংকট৷’’
বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত পাইলটরাই এ খাত চালিয়ে নিচ্ছেন বলে মত তার৷
তিনি বলেন, ‘‘ইঞ্জিনিয়ার, পাইলটসহ সব ধরনের জনবল সংকট রয়েছে এখানে৷ এভিয়েশন এমন একটা খাত, এর কোনো লোকাল স্ট্যান্ডার্ড নেই৷ সব গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড৷ তাই এটা অন্য যে কোনো ব্যবসা থেকে পৃথক৷ এখানেও অনেক চ্যালেঞ্জ৷
তিনি বলেন, এখানে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ যন্ত্রাংশের অভাব৷ সব পার্টসই বিদেশ থেকে আনতে হয়৷ আনতে গিয়ে যথাসময়ে আনা যায় না৷ কাস্টমসের লোকজন এখানকার ইমার্জেন্সি বোঝে না৷ জরিমানা করে৷ এসবে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷

শেয়ার করুন

এই সম্পর্কিত আরও খবর...

কারিগরী সহায়তায়: নি-টেক